রিপোর্টার্স বিডি ডট কম : এবারের ঈদে অনেকেই রাজনের দরিদ্র পরিবারকে নগদ অর্থসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী পাঠিয়েছেন। মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজন তার বাবা-মা ও ছোট ভাই সাজনের জন্য পাঠিয়েছেন অনেক ঈদ উপহার। কিন্তু যাকে উপলক্ষ করে এ উপহার সে যে সব আনন্দ আর উপহারের উর্ধ্বে চলে গেছে। তাই কোনো কিছুই এনে দিতে পারেনি রাজনের ঘরে আনন্দ। লাখ লাখ টাকার অর্থ সহায়তা ও ঈদ উপহারের মন ভরছে না রাজনের বাবা-মা আর একমাত্র ছোট ভাই সাজনেরও। রাজন ঈদ এলেই নতুন জামা কেনার জন্য বায়না ধরতো তার বাবার কাছে। এবারের ঈদেও তার ইচ্ছে ছিল নতুন জামা পরে বাবার হাত ধরে ঈদগাহে যাবে। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি। একারণে রাজনের পরিবারের কোনো আনন্দ-উচ্ছ্বাস নেই। আছে শুধু হাহাকার।১৫ জুলাই নির্মম নির্যাতনে নিহত শিশু রাজনের পরিবারকে শান্ত্বনা দিতে তাদের শহরতলির গ্রামে ছুটে যান নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। সেদিন তিনি রাজনের বাবার হাতে ১লাখ টাকার চেক তুলে দেন তিনি। বলেন এই টাকা দিয়ে আপনারা ঈদ করবেন। সরকার আপনাদের পাশে থাকবে। এর দুই দিনের মাথায় শুক্রবার বাদে আলী গ্রামে যান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি রাজনের শোকে পাথর হয়ে যাওয়া বাবা-মাকে শান্ত্বনা দিয়ে খুনিদের ও তাদের রক্ষায় সহায়তা করেছে এমন কাউকে ছাড় না দেয়ার কথা জানিয়ে নিহত রাজন পরিবারকে ৫ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেন। সর্বশেষ শনিবার রাজনের বাড়িতে ঈদ উপহার পাঠিয়েছেন সিলেটের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী। শুক্রবার সন্ধ্যার পর ছাত্রলীগের দুই কর্মীর মাধ্যমে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলি গ্রামে রাজনদের বাাড়িতে এই উপহার পাঠান তিনি।ঈদ উপহারের মধ্যে রয়েছে রাজনের মায়ের জন্য দুইটি শাড়ি, বাবার জন্য লুঙ্গি ও রাজনের ছোট ভাই সাজনের জন্য ঈদের নতুন জামা, সেমাই, দুধ, চিনি, তেল প্রভৃতি। কিন্তু এর কিছুতেই আজ আনন্দিত হতে পারেনি রাজনের পরিবার। বরং তাদের কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।পরিবারের শত অভারের মধ্যেও যার দুরন্তপনায় ঘর উৎসবে ভরে উঠতো সেই রাজন আর কখনো ফিরবে না। ঈদের খুশি ছুঁয়ে যাবে না ছোট্ট সেই রাজনকে। নতুন জামা কিনে দেয়ার আবদার করবে না কোনো দিন। এই ভেবেই তার বাবা-মা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বার বার।ঈদের দিনে ভোর হতে না হতেই যে পরিবারে এতো দিন শুরু হতো ঈদ আয়োজনের তোড়জোড় যেখানে এখন শুধুই হাহাকার, কান্না। রাজনের স্বজনদের শান্ত্বনা দেয়ার ভাষাও নেই আজ প্রতিবেশীদের। তারা শুধু তাদের কষ্টের অংশীদার হচ্ছেন। নীরবে চোখ মুছছেন। রাজনকে নির্যাতন করে হত্যার দৃশ্য যে সারাজীবন তাদের এবং সারা দেশের মানুষকে কাঁদাবে! সিলেট শহরতলির কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদে আলী গ্রামের বাসিন্দা মাইক্রোবাস চালক বাবা শেখ আজিজুর রহমান ও গৃহিণী মা লুবনা আক্তারের প্রথম ছেলে রাজন। স্থানীয় অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিল সে।এরপরে আর পড়া হয়নি অভাবের কারণে। সংসারে একটু স্বচ্ছলতা আনতে সবজি বিক্রি করত রাজন। কিন্তু একদল মানুষরূপী পশু সেই শিশুকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে মেরেছে। পৈশাচিক উল্লাস করেছে। সেই দৃশ্য ভিডিওতে ধারণ করে ছড়িয়েছে ইন্টারনেটে। নিষ্ঠুরতার কোনো ঘাটতি রাখেনি পশুর দল। শনিবার বাদে আালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রাজনের বাড়িতে ঈদের আনন্দের বদলে এখন বাবা-মায়ের বুকফাটা কান্না আর হাহাকার। ছোটভাই সাজন যেই তাদের ঘরে যায় তাকেই বড় ভাই রাজনের খুনিদের ফাঁসির দাবি সম্ভলিত একটি পোস্টার এনে দেখিয়ে বলে এই দেখ ভাইয়াকে ওরা (ওরা) মেরে ফেলেছে।
মমতাময়ী মা লুবনা আদরের ছেলেকে হারিয়ে আজ পাগলপ্রায়। তিনি রাজনের গেল ঈদের বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতিচারণ করে ঢুকরে উঠেন। এখন তার একটাই দাবি ছেলের খুনিদের যেন ফাঁসি হয়। প্রতি বছর ঈদে ছেলে রাজনকে পরম যত্নে সেমাই মুখে তুলে দিতেন মা লুবনা আক্তার। সেই আদরের সন্তান আজ নেই। তার ছবি বুকে জড়িয়ে বিলাপ করে বলছিলেন, আমাদের কিসের ঈদ। সব আনন্দ কেড়ে নিয়েছে ওই পাষণ্ডরা। ওদের বিচার চাই, ফাঁসি চাই। ওরা আমার ওইটুকু ছেলেকে ‘চোর’ অপবাদে পিটিয়ে মেরেই ফেলল।
দুরন্ত ছেলে আজ শান্ত হয়ে শুয়ে আছে বাড়ির পাশের কবরে। তাই নির্বাক বাবা শেখ আজিজুর রহমান নীরবে তাকিয়ে থাকেন ছেলের কবরের দিকে। আজিজুর রহমান বলেন, প্রতি ঈদে ছেলেটা নতুন কাপড় কিনে দেয়ার আবদার করত। এবার ও কবরে শুয়ে আছে, আমরা কীভাবে ঈদের আনন্দ করি? আমরা তার খুনিদের বিচার চাই। ঈদের নামাজ শেষে প্রতিবেশীরা সবাই এসেছেন রাজনদের ঘরে। কিন্তু কারো মুখেই আনন্দের ছাপ নেই। এক রাশ কষ্ট বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে তাদের কষ্টের অংশীদার হচ্ছেন। রাজনের মা-বাবার কান্নার আর্তি চোখ ভেজাচ্ছে সবার। প্রসঙ্গত, ৮ জুলাই সিলেট সদর উপজেলার কুমারগাঁও বাস স্টেশন এলাকার একটি ওয়ার্কশপের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে প্রায় দেড় ঘণ্টা অমানুষিক নির্যাতন করে ১৩ বছরের শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর একটি মাইক্রোবাসে করে মরদেহ গুম করার সময় হাতে নাতে ধরা পড়ে খুনিদের একজন মুহিত। হত্যকান্ডের তিনদিনের মাথায় শিশু রাজনকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করার একটি ভিডিও ক্লিপ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর পরই দেশব্যাপি ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদ ও খুনিদের ফাঁসির দাবিতে দেশব্যাপি একের পর কর্মসূচি পালন হতে থাকে। প্রতিবাদের ঝড় উঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক-টুইটারেও। -
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন Blogger Facebook