রিপোর্টার্স বিডি নিউজ ডেস্ক : চিকিৎসক ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা আর অনিয়মের কারণে পদে পদে ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগী-সাধারণরা। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত হাসপাতালের আউটডোর ও ওয়ার্ডে অবস্থান করে এমন চিত্র দেখা গেছে।
দুপুর সাড়ে ১২টায় ওসমানী হাসপাতালের আউটডোর কমপ্লেক্স এর বহির্বিভাগের তৃতীয়তলায় চর্মরোগ বিভাগের ৩ নম্বর কক্ষের দরজার সামনে দেখা গেল একজন সত্তরোবর্ধ বৃদ্ধ ও একজন নারী একটি ১৪ মাসের একটি শিশুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভেতরে দু’জন (একজন পুরুষ ও একজন নারী) চিকিৎসকও চেম্বারে বসে খোঁশ গল্প করছেন।
রোগী দেখাচ্ছেন না কেন প্রশ্ন করতেই সিলেটের দক্ষিণ সুরমার খালোপাড় থেকে নাতিকে নিয়ে আসা সুন্দর মিয়া জাগো নিউজকে জানালেন, আধাঘণ্টা ধরে এখানে দাড়িয়ে আছি। ডাক্তাররা চা খাবেন তাই রোগী দেখবেন না। পরে দেখবেন, এখন চা-খেয়ে তারা গল্প করছেন, কখন যে এই গল্প শেষ হবে আর ডাকবে আল্লাহই জানেন।
এ প্রতিবেদক তখন পরিচয় না দিয়ে চেম্বারের দিকে আগ বাড়াতেই চিকিৎসক সহকারী চেচিয়ে ওঠে বললেন, দেখছেন না স্যার চা খাচ্ছেন পাগল হয়ে গেছেন কেন? এখানে লাইনে দাঁড়ান। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর রোগীদের ডাক পড়লো। শিশু রোগীদের দেখে মুহুর্তেই ওষুধ দিয়ে অভিভাবকদের বিদায় করছেন। কিছু জানতে চাইলেই চিকিৎসকরা রাগ করে বলছেন যান এখন যান সব প্যাকজিশনে লেখা আছে।
এমন চিত্র হাসপাতালের পুরো বহির্বিভাগেই। এ বহির্বিভাগে গড়ে প্রতিদিন ২ থেকে আড়াই হাজার রোগী ডাক্তার দেখিয়ে থাকেন। সিলেট বিভাগের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সহজ সরল এই গরিব মানুষগুলো ভোরে রওয়ানা দিয়ে সরকারি চিকিৎসক দেখানোর জন্য শহরে এসে পড়েন নানা ভোগান্তিতে। প্রথমে টিকেটের জন্য তাদের দাঁড়াতে হয় লম্বা লাইনে।
এরপর ডাক্তারের কক্ষের সামনে লম্বা লাইন। দিয়ে কোনোভাবে ডাক্তার দেখানো গেলেও ওষুধ নিতে গিয়েও লাইন। এই লাইন দিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরতে তাদের পুরো দিন লেগে যায়। এরমধ্যে এই সহজ-সরল মানুষগুলোকে অভারটেক করে লাইনে না দাঁড়িয়েই ডাক্তার দেখিয়ে চলে শহরের লোকগুলো।
অথবা ২০/৩০ টাকা দিয়ে চিকিৎসক সহকারীকে ম্যানেজ করেও একশ্রেণির লোক লাইনে না গিয়ে চিকিৎসক দেখানোর সুযোগ নিচ্ছেন। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্বলদের দাঁড়িয়েই থাকতে হচ্ছে। একই অবস্থা হাসপাতালের ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীদের বেলায়ও।
ওয়ার্ডবয়কে টাকা দিলে মিলে ভালো আচরণ ও বেড। টাকা নাই তো ভালো আচরণও নাই, বেডও নাই। ফ্লোরে থাকতে হচ্ছে। বেড থাকা সত্ত্বেও গরিব লোকদের থাকতে হয় ফ্লোরে। বিছনার চাদরও বদল হয়না এক সপ্তাহে।
রোগীদের হয়রানি ও টাকা ছাড়া চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা কাজ করেন না। অন্যদিকে চিকিৎসকদের গাফিলতি এসব অভিযোগ সর্ম্পকিত প্রশ্নের জবাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেখান নানা যুক্তি। এই যুক্তির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেডের সংখ্যা ৫০০। আর চিকিৎসার ওষুধ ও খাবারের আয়োজন রয়েছে ৯০০ রোগীর। এ কারণে যারা দায়িত্বে রয়েছেন তারা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। অতিরিক্ত রোগী হওয়ার কারণে চিকিৎসা সেবার মান তেমন ভালো নয় বলে জানান একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা।
হাসপাতালে প্রফেসর, সহযোগী প্রফেসরদের সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। আর বাকি সময় তারা বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। ফলে তাদের কাছ থেকে সঠিক সেবা পায় না রোগীরা। ওই সময় কেবল ইন্টার্নি ডাক্তারনির্ভর চিকিৎসা চলে হাসপাতালে।
একই সঙ্গে হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে রোগ নির্ণয়ের সব সরঞ্জাম থাকলেও অধিকাংশ সময় সেগুলো অকেজো বলে জানিয়ে দেয়া হয়। এর ফাঁকে একশ্রেণির দালালরা দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের কৌশলে নিয়ে যায় নিজেদের প্যাথলজি সেন্টারে। কখনও কখনও ডাক্তার ও নার্সরা তাদের নির্ধারিত প্যাথলজি সেন্টারে রোগীদের পাঠিয়ে দেন। আর গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি হলেই দেয়া হয় একাধিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষাগুলোও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করা হয় না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্ত থাকলেও রক্ত সিন্ডিকেটের কারণে বাইরে থেকে পরীক্ষা ছাড়াই রক্ত নিয়ে আসেন রোগীর স্বজনরা। বেশির ভাগ রোগীর বেলায় রক্ত না ব্যবহার হলেও এসব রক্ত চোরাই পথে আবার নিয়ে যাওয়া হয় ওইসব প্যাথলজি সেন্টারে। হাসপাতালের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
অপারেশন থিয়েটারকে ঘিরে চলছে রমরমা বাণিজ্য। একজন রোগীর বেলা যতটুকু সার্জারি সরঞ্জামাদি প্রয়োজন তার চেয়ে দিগুণ সরঞ্জামাদি লিখে দেয়া হচ্ছে। কখনও কখনও দালালদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে রোগীর স্বজনরা এক হাজার টাকার সরঞ্জাম ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায় ক্রয় করতে হচ্ছে।
বাইরে থেকে ওষুধ আনার জন্য শতাধিক দালালের সমন্বয়ে রয়েছে সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা হাসপাতালের ভেতরে পুলিশের সহায়তায় দেদারসে চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসা। এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক একাধিক অভিযান পরিচালিত করেন। গ্রেফতার করা হয় বেশ কয়েক জনকে। এরপরও হাসপাতালের বাইরে থাকা ফার্মেসিগুলোর নিয়োজিত দালালদের দৌরাত্ম্য কমছে না। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে।
ওসমানী হাসপাতালে ব্রাদার ও নার্সরা বেড নিয়ে বাণিজ্য করেন। ভর্তি হতে আসা রোগীদের কাছে বেড সঙ্কটের কথা জানিয়ে দেয়া হয়। বেড খালি থাকলেও তাদের দেয়া হয় না। পরে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায়ের পর তাদের বেড দেয়া হয়। আর এ বেডের চার্জ হিসেবে নিয়মিত টাকা পরিশোধ করতে হয় রোগীদের স্বজনদের।
জরুরি অসুস্থ রোগীদের আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে ট্রলি মিলে না প্রায় সময়। ট্রলি বহনকারী কর্মচারীরা রোগী আনা নেয়ার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে বসেন। টাকা দিলে ট্রলি মিলে অন্যথায় রোগীদের স্বজনদের কাঁধে ভর দিয়ে চলতে হয়।
হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ড, শিশু ওয়ার্ড, করোনারি ওয়ার্ড, সার্জারি ওয়ার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোয় ডাক্তারদের অবহেলা উলেখযোগ্য। এসব ওয়ার্ডে বেশির ভাগই জরুরি রোগী থাকলেও প্রফেসর ও সহযোগী প্রফেসরদের সময় মতো না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে রোগী মারা যাচ্ছে।
হাসপাতলের ১১ নম্বর ওয়ার্ডে সপ্তাহ ধরে চিকিৎসাধীন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিদিন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে তাদের রোগীর ড্রেসিং করতে হয়। কিন্তু অপারেশন থিয়েটারের সহকারীদের টাকা না দিলে রোগীদের ফেলে রাখে। আর পরে আসা রোগীরা টকা দিলে তাদেরটা আগে করে দেয়। তাই তিনি বাধ্য হয়ে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে ঘুষ দিয়ে ড্রেসিং করান। টাকা না দিলে ওয়ার্ড বয়রা রোগীকে ধরতেই চায় না।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আবদুছ ছালাম জাগো নিউজকে বলেন, বেশির ভাগ অভিযোগ ঠিক নয়। তবে অনেকেই হাসপাতালের সব কিছু জানেন না। এ কারণে তারা একশ্রেণির দালাল এর হাতে প্রতারিত হচ্ছেন। কিছুদিন পরপরই হাসপাতালের দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়।
তিনি এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৫০০ বেডের হাসপাতাল এক সরকারি আদেশে ৯০০ বেডে উন্নিত করা হয়। কিন্তু জনবল ও অবকাঠামো ৫০০ বেডেরই রয়ে গেছে। বিভাগের একমাত্র সরকারি বড় হসপাতাল হওয়ায় প্রতিদিন গড়ে ১৫০০ থেকে ১৬০০ রোগী ভর্তি থাকে। এদের সু-চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সবাইকে একটু বেগ পেতে হচ্ছে।
একনজরে ওসমানী হাসপাতাল : ১৯৩৬ সালে একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৪৮ সালে এই ইনস্টিটিউটকে মেডিকেল স্কুল এবং ১৯৬২ সালে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজে রূপান্তর করা হয়। পরে ১৯৭৮ সালে কাজলশাহ এলাকায় ২৫ একর জায়গায় মেডিকেল কলেজটি সম্প্রসারিত করা হয়। পুরোনো জনবল ঠিক রেখে ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালকে ১৯৯৮ সালে ৯০০ শয্যায় রূপান্তরিত করা হয়।
১৭ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও হাসপাতালে অনুমোদিত পদের সংখ্যা এখন পর্যন্ত বাড়ানো হয়নি। এসব শূন্যপদের কারণে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া ৯০০ শয্যার বিপরীতে আন্তবিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ রোগী ভর্তি থাকছে। বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
৫০০ শয্যা থাকাকালে হাসপাতালে কর্মরতদের পদের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২১। শয্যাসংখ্যা বাড়লেও এ অবস্থার উন্নতি আজ পর্যন্ত হয়নি।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন Blogger Facebook