শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের অধীনে সরকারিভাবে ইতিপূর্বে একটি উন্নতমানের ডাটা সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ডাটার অভাবে এটি পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এর ধারণ ক্ষমতার মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে এখন পর্যন্ত। তারপরও অত্যাধুনিক ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি নতুন ডাটা সেন্টার স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। শুধু হাতে নেয়াই নয়, কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে অতি দ্রুতগতিতে এটি এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যা শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, এর সার্বিক কার্যক্রম প্রশ্ন সাপেক্ষও বটে। মূলত একটি বড় অংকের অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই এই অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল প্রকল্প নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছেন আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তা-ব্যক্তিরা। জানা গেছে, ‘ফোর টায়ার’ নামে এই ডাটা সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৯৯ কোটি ৩৫ লাখ ২০ হাজার টাকা অর্থাৎ প্রায় ১২০০ কোটি টাকা। কিন্তু, সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এই ডাটা সেন্টার স্থাপনে যে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে তা একেবারেই অস্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক দর এবং এই ডাটা সেন্টারের যন্ত্রপাতির মান অনুযায়ী এরজন্য প্রকৃত ব্যয় হবার কথা বড়জোর ৮০০ কোটি টাকা। প্রায় এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৪০০ কোটি টাকাই একটি বিশেষ মহলের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হতে যাচ্ছে। চীন থেকে নেয়া বৈদেশিক ঋণে এই প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সবচে’ গুরুতর বিষয় হলো, এতো অর্থ ব্যয়ে ডাটা সেন্টার নির্মাণের পর এটি এ মুহূর্তে কোনো কাজেই আসবে না। তাছাড়া এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরও যাচাই করা হচ্ছে না। যদিও সরকারের ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক দর যাচাই করা অপরিহার্য এবং এই দর হতে হবে অবশ্যই প্রতিযোগিতামূলক। সূত্র জানায়, ইতিপূর্বে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ২০১৩ সালের ২১ আগস্ট চীনের জেডটিই কর্পোরেশনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। সেই অনুযায়ী জেডটিই ‘ফোর টায়ার’ ডাটা সেন্টার স্থাপনের জন্য প্রাথমিক সমীক্ষা সম্পাদন করে। অপরদিকে চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে ১৩৪ মিলিয়ন ডলার ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। এই ঋণের ব্যবস্থা করে জেডটিই। ইতিমধ্যে জেডটিই’র সঙ্গে আইসিটি বিভাগের গঠিত কারিগরি কমিটির কমার্শিয়াল নেগোসিয়েশন সম্পন্ন হয়। সেই কমার্শিয়াল নেগোসিয়েশনে প্রকল্পটির প্রাক্কলন করা হয় ১৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ প্রায় ১২০০ কোটি টাকা। যা ঋণ প্রস্তাবের চেয়েও বেশি। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বাস্তবে এটি নেগোসিয়েশন নয়। এটিকে দুর্নীতি ও ভাগ-বাটোয়ারার আলোচনা হিসেবেই আখ্যায়িত করছেন অভিজ্ঞমহল। কারণ, বাজার দর যাচাই করা হলে ১০০ মিলিয়ন ডলারেই এ ধরনের ডাটা সেন্টার স্থাপন করা সম্ভব।
জানা যায়, জেডটিই নামক কোম্পানিটি চীনের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে চীন সরকারের শেয়ার মাত্র ৩২%। অথচ এক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সহযোগিতার চুক্তি হয়েছে জিটুজি এর আওতায়। বলা হচ্ছে, জেডটিই সরকারি প্রতিষ্ঠান। সেই হিসেবেই জিটুজি চুক্তি করা হয়। কিন্তু, দেখা যাচ্ছে, এটি এক ধরনের প্রতারণা। বাস্তবে জেডটিই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এবং এর ওপর চীনা সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সরকারের ক্রয় নীতিমালা লঙ্ঘন অর্থাৎ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দর যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতাকে পাশ কাটানোর জন্যই আইসিটি বিভাগ চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে এই প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে।
জানা গেছে, এই প্রকল্পটির ডিপিপি প্রস্তুত ও পরিকল্পনা কমিশন থেকে অনুমোদনের আগেই ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। এসবের আগে কীভাবে ক্রয় চুক্তি মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা হলো তা বোধগম্য নয়। এক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের চরম ব্যত্যয় হয়েছে। এছাড়া চীনের সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ঋণের শর্তাদিও চূড়ান্ত করা হয়নি। ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে এসব অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠার পরও, এমনকি সিপিটিইউ’র আপত্তির পরও ঠেকিয়ে রাখা যায়নি দুর্নীতিবাজদের চাপের কারণে।
জানা গেছে, সবচে’ জালিয়াতি হয়েছে আইসিটি বিভাগের গঠিত টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন ও নেগোসিয়েশন কমিটির একজন সদস্যের উপস্থিত থাকা না থাকা নিয়ে। বুয়েটের একজন অধ্যাপক ড. এম মাহফুজুল ইসলামকে নেগোসিয়েশন কমিটির সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছিলো, যিনি মাত্র ২টি সভায় উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ধারাবাহিক অন্য সবগুলো সভাতেই অনুপস্থিত ছিলেন। অথচ তার স্বাক্ষর জাল করে তাকে সকল সভায় উপস্থিত দেখানো হয়েছে। নেগোসিয়েশন কাগজে এই জাল স্বাক্ষর রয়েছে। উল্লেথ্য, বিসিসি ভবনে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা সক্রিয় রয়েছে। মাহফুজুল ইসলামের উপস্থিতি-অনুপস্থিতির বিষয়টি এতে সহজেই নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি কোন কোন সভায় উপস্থিত ছিলেন তা জানা যাবে। যদিও এটা তদন্ত করতে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দেবেন না। কারণ, তাতে থলের বিড়াল বেরিয়ে যাবে।
এছাড়া আরেকটি জালিয়াতি হয়েছে এই প্রকল্পটির সমীক্ষা নিয়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে একটি নিরপেক্ষ সমীক্ষা চালানোর কথা ছিলো। কিন্তু, নিরপেক্ষ কোনো সমীক্ষা প্রতিবেদন না করে সাম্প্রতিককালে ২/১ জন কর্মকর্তা কর্তৃক একটি অসত্য ও জালিয়াতিমূলক প্রতিবেদন ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পেশ করা হয়েছে। অথচ এই সমীক্ষা প্রতিবেদন সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বাস্তবে এমন কোনো সমীক্ষা এ নিয়ে হয়নি। সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজের পক্ষ থেকে এ ধরনের তথ্য-প্রমাণ আইসিটি মন্ত্রণালয়ের কাছে চাওয়া হলে তারা সদুত্তর দিতে পারেননি।
জানা গেছে, এই উন্নতমানের ‘ফোর টায়ার’ ডাটা সেন্টারটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে ঢাকার উত্তরে কালিয়াকৈরে প্রস্তাবিত হাইকেট পার্ক এলাকায়। অথচ কালিয়াকৈরে এখনো ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। ডাটা সেন্টার পরিচালনার জন্য কোনো ব্যবস্থা এখন সেখানে নেই। এমনকি ডাটা সেন্টারের দুই দিক থেকে পাওয়ার সোর্সের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পাওয়ারের যে ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন তাও সেখানে নেই।
বলা হচ্ছে, প্রস্তাবিত ডাটা সেন্টারটি একতলা বিশিষ্ট ভবনে নিচের তলায় রাখা হবে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের উন্নতমানের আইসিটি যন্ত্রপাতি ৪/৫ তলায় সুরক্ষিতভাবে রাখা হয়।
সূত্রমতে, এ ধরনের ডাটা সেন্টার চালানোর জন্য যে বিশেষজ্ঞ জনবল প্রয়োজন, তা বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। দক্ষ জনবল হিসেবে দু’একজন যাও আছেন এরা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের বর্তমান ডাটা সেন্টারটি পরিচালনা করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। যদিও এটি ফোর টায়ার ডাটা সেন্টারের মতো তত উন্নতমানের নয়।
এছাড়া ডাটা হোস্টিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত ডাটাও সরকারের কাছে অনলাইনে নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সূত্রমতে, সরকারি ডাটাগুলো এখনো ‘র’ বা প্রাথমিক অবস্থায় রয়ে গেছে। অপরদিকে প্রাইভেট সংস্থা যেমন ব্যাংক বা বড় প্রতিষ্ঠান- এরা সরকারের কাছে ডাটা রাখার কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। আগ্রহও নেই এদের। ফলে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে যে ডাটা সেন্টার আছে এর মাত্র ২০ ভাগ এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকারের সমস্ত ডাটা অনলাইনে দেয়া হলেও বর্তমান ডাটা সেন্টারটির ৫০%-৬০% এর বেশি ব্যবহার করা যাবে না।
উল্লেখ্য, পৃথিবীতে মাত্র ৯টি ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার আছে। যার মধ্যে মাত্র ৫টি ব্যবহৃত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, হাইটেক পার্ক বা সফটওয়্যার পার্ক প্রতিষ্ঠা করার পর বাংলাদেশের এই ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার কাজে লাগবে। কিন্তু, পূর্ণাঙ্গভাবে হাইটেক পার্ক প্রতিষ্ঠা সময়সাপেক্ষ বা এখনো অনেক দূর বাকি। ততদিনে এই ফোর টায়ার ডাটা সেন্টারের অবস্থা কী দাঁড়াবে তা বলা বাহুল্য। দেখা যাবে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার কারণে ওই সময় পর্যন্ত ডাটা সেন্টারটি আর সচল থাকছে না। ইতিমধ্যে ডাটা সেন্টারের ওয়ারেন্টি পিরিঅড পার হয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে নেগোসিয়েশন করলে এ ধরনের ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার স্থাপনে সর্বোচ্চ ১০০ মিলিয়ন ডলারে কাজ সম্পাদন করা যেতো। অথচ, এক্ষেত্রে দর ধরা হয়েছে ১৫৪ মিলিয়ন ডলার, যা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। বাকি এই ৫৪ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হচ্ছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে। এই দুর্নীতির সঙ্গে মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়ের বাইরের ব্যক্তিরাও রয়েছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন Blogger Facebook