0

ershad1-310x165রিপোর্টার্স বিডি নিউজ ডেস্ক : রাজনৈতিকভাবে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা)। ভুগছে আত্মপরিচয় সংকটেও। সরকারি দল না বিরোধী দল এই দ্বন্দ্বে পড়েছে দলটি। কাগজে-কলমে জাপা বর্তমান সংসদের ‘প্রধান বিরোধী দল’, তবে সংসদের ভেতরে-বাইরে কোথাও কেউ দলটিকে ‘বিরোধী দল’ বলে সম্বোধন করা হয় না।  এমনকি আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের সংসদ সদস্যরাও প্রতিদিন সংসদে ‘বিরোধী দল’ হিসেবে সম্বোধন করে বিএনপিকে। সংসদে যখন বিএনপি-জামায়াত নিয়ে কথা হয়, তখন বোঝার উপায় থাকে না-এখানে জাপা নামের একটি ‘বিরোধী দল’ বসা আছে।  এরপর এরশাদ ও রওশন এরশাদের মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। দু’জনের এ দূরত্বের কারণে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির এমপিদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভক্তি। এরশাদ এক এক সময়ে এক এক রকম কথা বলে অনেক সময় হাস্যরসে পরিণত হন।  পরিচয় সংকট কাটাতে এবং নিজেদেরকে সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠায় জাপা শিগগিরই সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে বের হয়ে আসবে বলে জানিয়েছিলেন বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ। দশম সংসদ নির্বাচনের প্রথম বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ জানুয়ারি এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন ‘আমরা শিগগিরই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করবো, এনিয়ে দলের প্রেসিডিয়ামে আলোচনা হবে।’ তবে রওশনের এই বক্তব্যের এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই।  শুধু রওশন নয়, জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদও কিছুদিন আগে দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে বলেছিলেন ‘আমরা সরকারে না বিরোধী দলে, মানুষ আমাদের নিয়ে হাসে। কোথাও মুখ দেখাতে পারি না। এজন্য মন্ত্রিসভা থেকে আমাদের বের হতে হবে।’ এই বক্তব্যের কারণে তখন মন্ত্রিসভায় থাকা দলের নেতাদের সঙ্গে এরশাদের মতপার্থক্য দেখা দেয়। পরে অবশ্য এরশাদও চুপসে যান।  নির্বাচন সম্পর্কে এরশাদ বলেন, সব দল নির্বাচনে অংশ নিলে, পরিবেশ তৈরি হলে তার দলও নির্বাচনে অংশ নেবে। তিনি দাবি করেন, সব দল নির্বাচনে না গেলে নির্বাচনে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্যই তিনি দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার পরও সিদ্ধান্ত বদল করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে সব দল নির্বাচনে না আসা এবং চলমান বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি চোখের সামনে রেখে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেন কেন এরশাদ? তাহলে কি তার অবস্থান বদলের নেপথ্যে নির্বাচনের পরিবেশ কিংবা সব দলের অংশগ্রহণ মুখ্য বিষয় নয়, আরও অন্য কিছু আছে?  শুধু এক মুহূর্ত, একদিন, এক সপ্তাহ কিংবা এক মাস নয়, এরশাদ সব সময়ই কথার রদবদল করেন। এরশাদের বিভিন্ন বক্তব্য পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায়। ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট এরশাদ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেছিলেন, তিনি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। এরপর তিনি নির্বাচনে যান।  ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে এরশাদ বলেন, শেষ বয়সে তিনি কোলেবোরেটর হতে চান না; বিএনপি না গেলে জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে যাবে না। এর পর ১১ নভেম্বর তিনি বললেন, সব দল নির্বাচনে অংশ না নিলে সেখানে জাতীয় পার্টি থাকলে জনগণ থুতু দেবে। এর চেয়ে জেলে মরাই ভালো। ১৬ নভেম্বর তিনি আরও বলেন, সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া মহাজোটে থেকে নির্বাচনে অংশ নিলে সবাই বেঈমান বলবে।  তার এ বক্তব্য অবশ্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৭ নভেম্বর এরশাদ ঘোষণা দিলেন, জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে এবং সর্বদলীয় সরকারে যোগ দেবে। তখন তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাচন প্রয়োজন। নির্বাচনে না গেলে জনগণ তো থুতু দেবে। এরপর জাতীয় পার্টি নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে যোগ দিল। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রার্থী মনোনয়ন, মনোনয়নপত্র জমাদান সবকিছুই হলো। তার পর হঠাৎ করে আবারও সুর বদলালেন এরশাদ।  শাহবাগ গণজাগরণের শুরুতে বিদেশে বসে সমর্থন জানালেও পরে বলেন উল্টো কথা। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ রাজধানীর শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনকারীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ‘তারা যা করছে তা মেনে নেয়া যায় না’ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।  জাতীয় পার্টির অঙ্গ সংগঠন জাতীয় ওলামা পার্টিতে আলেম-ওলামাদের যোগদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন এরশাদ। তিনি বলেন, “দুঃখ লাগে শাহবাগের দিকে তাকালে। তারা যা করছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। দেশের কোথায় পতাকা উড়বে, সেটি তারা ঘোষণা দেয়ার কে? তারা কি সরকার হয়ে গেছে নাকি? এত ধৃষ্টতা মেনে নেয়া যায় না।”  জাপা সূত্র জানায়, পার্টির প্রায় ৩৫ এমপির ৩৫ মত। তাই পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের নির্দেশ না মানায় অনেককে নজরদারিতে রাখছেন তিনি। একই অবস্থান রওশনের মধ্যেও, তিনিও এরশাদপন্থী’ নেতাদের পাল্টা নজরদারিতে রাখছেন। এ কারণে অনেকে দু’কূল রক্ষা করতে গিয়ে এরশাদ ও রওশনের আস্থা হারাচ্ছেন।  ৭ জুলাই সংসদ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছিলেন ‘সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের যে মৌলিক চরিত্র হওয়া উচিত তা জাপার নেই। এখনকার বিরোধী দল একইসঙ্গে সরকারেও আছে, আবার বিরোধী দলেও রয়েছে। সেজন্য যে দলটিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটি আত্মপরিচয় সংকটে রয়েছে। হয় সোনার বাটি, না হয় পাথর বাটি হবে; দুটো একসঙ্গে হতে পারে না।  ২০১৫ সালের ৯ জুন হবিগঞ্জের এক সভায় ঘোষণা দেন মন্ত্রিসভা থেকে জাপার সদস্যরা বের হয়ে আসবেন। এরপর রংপুরেও তিনি একই বক্তব্য দেন। এর কিছুদিন পর এরশাদ জানিয়েছিলেন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় পার্টি মন্ত্রিসভা থেকে বের হয়ে আসবে।  ২০১৫ সালের ২৯ জুন সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় সংসদের শীর্ষ পদে থাকা নারীদের ‘শোপিস’ বলায় সংসদে নারীদের ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন এরশাদ। তীব্র প্রতিবাদের মুখে ওই বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। আর স্বামীর বক্তব্যে শব্দ চয়নে এই ধরনের ভুলের জন্য সেদিন সংসদে দাঁড়িয়ে ‘বোন’দের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন রওশন। পরের দিন নিজের স্ত্রী ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদকে ইঙ্গিত করে জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বলেছেন, ‘আমি কোনো ভুল করে থাকলে সেটি কেবলমাত্র আমি নিজে প্রত্যাহার করতে পারি কিংবা স্পিকার সেটি এক্সপাঞ্জ করতে পারেন। কিন্তু আমার বক্তব্যের জন্য অন্য কারও ক্ষমা চাওয়ার অধিকার নেই।  ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ বলেছেন, ‘এক সময় বিএনপি ও তার দোসররা জাপাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, কিন্তু আজ তারা নিজেরাই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।’  মঙ্গলবার তার বনানী কার্যালয়ে বরগুনার জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রাক্তণ এমপি জাফরুল হাসান ফরহাদের জাপায় যোগদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।  এরশাদ বলেন, ‘দেশের মানুষ এখন জাপাকে চায়। আগামীতে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জাপায় যোগ দেবেন।’  সরকারের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত বলেন, ‘যে দেশে মায়ের পেটের শিশু নিরাপদ নয়, সে দেশে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা থাকবে কীভাবে? যেভাবে দেশে নারী-শিশুকে নির্যাতন ও হত্যা করা হচ্ছে, তা কারও কাছে কাম্য হতে পারে না। জড়িতদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন Blogger

 
Top