0
23.-news

হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য

সিলেটের প্রবীণ নাট্যজন ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের শেষকৃত্য নগরীর চালিবন্দর মহাশ্মশানে সম্পন্ন হয়েছে। সিলেটের সাংস্কতিক পরিমণ্ডলে বাবুল দা নামে পরিচিত হয়ে উঠা হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।তিনি দীর্ঘদিন ধরেই বাধ্যক্যজনিত দূরারোগ্য ব্যধিতে ভুগছিলেন। চলতি মাসের প্রথম দিকে গুরুতর অসুস্থ্য অবস্থায় তাকে রাগীব রাবেয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তরিত করা হয়। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় শনিবার সকালে তিনি পরলোকগমন করেন।শনিবার বিকেল ৪টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তার মরদেহ সকলস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণের জন্য রাখা হয়। এ সময় তাকে শেষ দেখা দেখতে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। তাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিয়েই শেষ বিদায় নেন এই গুণী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।শহীদ মিনার থেকে বিকাল পৌনে ৫টায় তার মরদেহ নগরীর নাইয়রপুলস্থ শ্রীরামকৃষ্ণ মিশনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের পর তার মরদেহ নগরীর চালিবন্দর মহাশ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকাল সোয়া ৫টায় মহাশ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এসময় তার পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও তার আত্মীয়স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী উপস্থিত ছিলেন।সিলেটের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ও বিকাশে বটবৃক্ষ হয়ে থাকা এই ব্যক্তিত্বের শেষ বিদায় ও শেষকৃত্যানুষ্ঠানে সিলেটের ৫০ এরও অধিক সংগঠনের সদস্যসহ তার হাজারো গুণগ্রাহী ও শিষ্য। এ সময় ১ মিনিটে মৌনভাবে দাড়িয়ে তার মৃতদেহের প্রতি সম্মান জানানো হয়।সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেট-র ব্যবস্থাপনায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদানে তার মৃতদেহে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে শেষ বিদায় জানায় সিলেট সিটি কর্পোরেশন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি সিলেট জেলা শাখা, সিলেট জেলা প্রেসক্লাব, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদ, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী সিলেট জেলা, চারণ সাংস্কৃতিক সংগঠন, নৃত্যশৈলী, যুগান্তর স্বজন সমাবেশ, নাট্যমঞ্চ, নবশিখা নাট্যদল, দিগন্ত থিয়েটার, থিয়েটার মুরারীচাঁদ, মৃত্তিকায় মহাকাল সহ অসংখ্য সংগঠন ও সংগঠনের সংগঠক এবং কর্মীবৃন্দ।

তার শ্রদ্ধাঞ্জলিপ্রদানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কবি এ কে শেরাম, মুক্তিযোদ্ধা ও নাট্য ব্যক্তিত্ব ভবতোষ রায় বর্মন রানা, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালিক, আবৃত্তিকার মোকাদ্দেস বাবুল, সংস্কৃতিজন শামসুল আলম সেলিম, নাট্যজন আনোয়ার হোসেন রনি, খোয়াজ রহিম সবুজ, কবি তুষার কর, শুভেন্দু ইমাম, অংশুমান দত্ত অঞ্জন, মিশফাক আহমেদ মিশু, রতন দেব, আমিরুল ইসলাম চৌধুরী বাবু, মরিয়ম বেগম, এনামুল মুনীর, আফজাল হোসেন, রজত কান্তি গুপ্ত, সরোজ চক্রবর্তী, নীলাঞ্জনা দাশ জুঁই, সুমনকুমার দাশ, অসিত বরণ দাশগুপ্ত, উজ্জ্বল চক্রবর্তী, রুবেল আহমদ কুয়াশা, পুলিণ রায়, কবি জাফর ওবায়েদ, কমলজিৎ শাওন, কবি মেকদাদ মেঘ প্রমুখ।হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য। ১৯৪০সালের ১৮ অক্টোবর নগরীর কাষ্টঘরের এক সম্ভ্রান্ত ব্রাক্ষ্মণ পরিবারে জন্ম নেয়ার পর ধীরে ধীরে সিলেটবাসীর প্রাণপ্রিয় বাবুল দা হয়ে উঠেছিলেন। তার পিতা স্বর্গীয় হৃদয়রঞ্জন ভট্টাচার্য ও মাতা স্বর্গীয় কুমুদিনী ভট্টাচার্য। রাজা জিসি স্কুল থেকে এনট্রান্স ও এমসি কলেজ থেকে এফএ পাশ করার পর মদন মোহন কলেজ থেকে বিকম পাশ করেন তিনি।কৈশোর পার না হতেই পরিবার ছাড়িয়ে তার পরিসর বিস্তৃত হতে তাকে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। ১৯৫৮ সালে প্রথম নির্দেশনা দেন শ্রীমধুসূদন নাটকের। তার নির্দেশনায় প্রতি বছর নগরীর বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় নাটক মঞ্চস্ত হত এবং মদন মোহন ছাড়াও এমসি কলেজের সাংস্কৃতিক চর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এই গুণী।মদন মোহন কলেজে কেদার দা ও ভাড়াটে চাই নাটকে নির্দেশনা প্রদান করেন তিনি। ডাকঘর, সীতাহরণ, কান্নাসহ অসংখ্য নাটকে তিনি অভিনয়ও করেন। ১৯৬৩ সালে তার প্রতিষ্ঠিত বৈশাখী নাট্য গোষ্ঠীতে বিসর্জন, এখনো দুঃসময়, স্পার্টাকাস বিষয়ক জটিলতা, সুবচন নির্বাসনেসহ অসংখ্য কালজয়ী নাটকের নির্দেশনা দেন।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর অবদান ব্যাপক। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন সর্বক্ষণ। দেশের স্বাধীকার আন্দোলনেও রাখেন অগ্রণী ভূমিকা। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে কলমতুলি কন্ঠ সংগ্রাম পরিষদ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে রাখে ব্যাপক ভূমিকা।

১৯৭১ সালের ২২ মার্চ সিলেটের রেজিস্ট্রি মাঠে, কবি দিলওয়ার রচিত দুর্জয় বাংলা শীর্ষক গীতি আলেখ্য আয়োজন করে এই সংগঠন। এই অনুষ্ঠানের ধারাভাষ্যকার ছিলেন হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য।

এছাড়াও সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাস্তবায়ন পরিষদের সাথে যুক্ত থেকে তিনি সিলেটের শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদের সিলেট শাখার উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সিলেট অডিটোরিয়াম যা বর্তমানে কবি নজরুল অডিটোরিয়াম, এর প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা পালন করেন হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য।সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেট-র প্রতিষ্ঠাতা প্রধান পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেট-র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য দায়িত্ব পালন করেন ২০১১ সাল পর্যন্ত।সিলেট শিশূ একাডেমির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি বিনা পারিশ্রমিকে শিশূদের আবৃত্তি প্রশিক্ষক হিসেবে ২৫ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমির আবৃত্তি প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তার অনস্বীকার্য অবদানের জন্য তার জীবদ্দশায় সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সম্মাননা ছাড়াও অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। এছাড়াও সম্মানিত হয়েছেন সর্বক্ষেত্রে। পেয়েছেন অসংখ্য গুণগ্রাহী আর শিষ্য। আর তার শেষকৃত্যে এই গুণগ্রাহীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়েই তিনি শেষ বিদায় নেন সিলেটর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বটবৃক্ষ হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য অথবা সকলের প্রিয় ব্যক্তি বাবুল দা।-বিজ্ঞপ্তি


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন Blogger

 
Top